ঢাকা , রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬ , ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

একের পর এক প্রাণীর মৃত্যু, চুরি ও অব্যবস্থাপনা

জৌলুস হারাচ্ছে গাজীপুর সাফারি পার্ক

ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় : ০৪-১০-২০২৬ ১০:৫২:৫২ পূর্বাহ্ন
আপডেট সময় : ০৪-১০-২০২৬ ১০:৫২:৫২ পূর্বাহ্ন
জৌলুস হারাচ্ছে গাজীপুর সাফারি পার্ক ফাইল ছবি
বিশ্ব প্রাণী দিবস আজ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রোববার (৪ অক্টোবর) প্রাণীর অধিকার, কল্যাণ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবিতে দিবসটি পালিত হচ্ছে। অথচ দেশের সবচেয়ে বড় গাজীপুর সাফারি পার্কে একের পর এক প্রাণীর মৃত্যু, চুরি ও পাচারের ঘটনা এবং দীর্ঘদিন ধরে প্রাণীদের অনুপযুক্ত পরিবেশে রাখার অভিযোগ উঠছে। এতে পার্কটির ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

তবে গত কয়েক বছরে প্রাণী ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা, জনবল সংকট ও অবকাঠামোগত নানা সমস্যায় পার্কটির জৌলুস কমেছে। একের পর এক প্রাণী মারা গেছে। কিছু প্রাণী চুরি ও পাচার হয়েছে। আবার উদ্ধার করা প্রাণীদের অনেককে বছরের পর বছর কোয়ারেন্টাইনের নামে ছোট খাঁচায় রাখার অভিযোগ রয়েছে।

পার্ক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০২২ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ১১টি জেব্রা, একটি বাঘ ও একটি সিংহী মারা যায়। এর আগে একটি হাতিও মারা যায়। গত ৬ ও ৭ আগস্ট আরও দুটি হাতির মৃত্যু হয়েছে।

পার্ক প্রতিষ্ঠার সময় বিদেশ থেকে ১২টি জিরাফ আনা হয়েছিল। সেগুলো চারটি বাচ্চার জন্মও দিয়েছিল। পরে একে একে মারা যায় সব জিরাফ। ২০২৫ সালে সর্বশেষ জিরাফটির মৃত্যু হলে পার্কটি জিরাফশূন্য হয়ে পড়ে। একইভাবে ২০১৩ সালে তিনটি ক্যাঙ্গারু আনা হয়েছিল। ২০১৭ সালে একটি বাচ্চার জন্ম হলেও পরে ক্যাঙ্গারুগুলোও মারা যায়।

চুরি ও পাচার

শুধু প্রাণীর মৃত্যু নয়, পার্কের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ২০২৪ সালের ২২ নভেম্বর সাফারি কিংডম এলাকা থেকে দুটি গ্রিন উইং ম্যাকাও চুরি হয়। একটি পাখি উদ্ধার ও একজনকে আটক করা হলেও ঘটনার পুরো রহস্য উদ্ঘাটন হয়নি।

এরপর ২০২৫ সালের ১৬ জানুয়ারি একটি নীলগাই পার্ক থেকে নিখোঁজ হয়। একই বছরের মার্চে পার্ক থেকে তিনটি রিং-টেইলড লেমুর চুরি হয়। তদন্ত শেষে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) জানায়, লেমুরগুলো সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পাচার হয়েছে।

এর আগে ২০১৮ সালে বিমানবন্দরে পাচারের সময় উদ্ধার হওয়া লেমুরসহ বিপন্ন বিভিন্ন প্রাণী সাফারি পার্কে আনা হয়েছিল। উদ্ধার করা লেমুরগুলোর একটি বাচ্চাও জন্মেছিল পার্কে। পরে একটি লেমুর মারা যায়। সর্বশেষ তিনটি লেমুর চুরি হয়ে যাওয়ার পর পার্কটি লেমুরশূন্য হয়ে পড়ে। পরে ঢাকার শ্যামবাজার থেকে একটি পুরুষ রিং-টেইলড লেমুর উদ্ধার করা হলেও বাকি দুটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

লেমুর চুরির ঘটনায় পার্কের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার এক নিকটাত্মীয়কে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তিনি পার্কের একজন আউটসোর্সিং কর্মচারী ছিলেন।

বারবার প্রাণী চুরি ও পাচারের ঘটনার পর এবার প্রাণীর পরিচয় নিশ্চিত করতে মাইক্রোচিপ বসানো এবং ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের উদ্যোগ নিয়েছে বন বিভাগ। বন অধিদপ্তরের বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের বন সংরক্ষক ছানাউল্যা পাটওয়ারী বলেন, সংবেদনশীল ও দুর্লভ বন্যপ্রাণীর ডিএনএ প্রোফাইলিং এবং মাইক্রোচিপ বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কাজটি করবে বন বিভাগের বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট।

ছোট কক্ষে লেপার্ড

সাফারি পার্কে প্রাণী অব্যবস্থাপনার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ দুটি লেপার্ড। পাচারের সময় উদ্ধার করা লেপার্ড দুটিকে তিন সপ্তাহের কোয়ারেন্টাইনে রাখার কথা থাকলেও প্রায় ৯ বছর ধরে তারা একই ধরনের সংকীর্ণ আবাসনে রয়েছে।

সম্প্রতি পিপল ফর অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের একটি প্রতিনিধি দল পার্ক পরিদর্শন করে লেপার্ড দুটির আবাসন ও চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, লেপার্ডের জন্য এমন ইনক্লোজার প্রয়োজন, যেখানে পর্যাপ্ত উচ্চতা, সূর্যের আলো ও চলাফেরার সুযোগ থাকবে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে প্রাণী দুটি যে স্থানে রয়েছে, সেটি তাদের উপযোগী করে তৈরি হয়নি।

লেপার্ড দুটির ইউরিনেশনের সমস্যা রয়েছে। দুর্গন্ধের কারণে সেখানে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা না হলে তাদের অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

তবে দীর্ঘদিন ধরে সংকীর্ণ আবাসনে থাকা লেপার্ড দুটির জন্য আধা প্রাকৃতিক গারদ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তারেক রহমান।

ভালো নেই ১৩ ভালুক

উদ্ধার ও জব্দ করা প্রাণীদের ব্যবস্থাপনাও প্রশ্নের মুখে। পার্কে নিজস্ব প্রাণীসহ বেশ কয়েকটি ভালুককে ছোট ও স্যাঁতসেঁতে সেলে রাখার অভিযোগ করেছে অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন।

সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কোয়ারেন্টাইন এলাকায় থাকা ১৩টি ভালুকের জন্যও পর্যাপ্ত জায়গা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়নি। হাতিদের ব্যবস্থাপনা নিয়েও তারা উদ্বেগ জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ, হাতিগুলো দীর্ঘ সময় শেকলে বাঁধা থাকে এবং স্বাভাবিকভাবে বিচরণের সুযোগ পায় না।

এ বিষয়ে বন বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে একাধিক চিঠি দেওয়া হয়েছে। চলতি বছরের ২০ জুন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বন বিভাগকে আইনি নোটিশও দেওয়া হয়। তবে আশানুরূপ জবাব পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া।

রাজস্ব আদায়েও বড় ঘাটতি

পার্কের ব্যবস্থাপনায় আর্থিক দিক থেকেও নানা প্রশ্ন রয়েছে। প্রতিষ্ঠার পর মূল ফটকসহ বিভিন্ন ইভেন্ট ইজারা দেওয়া হলেও বন বিভাগের প্রায় আট কোটি টাকা ইজারা বকেয়া পড়ে থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। পাওনা আদায়ে মামলা করেই দায়িত্ব শেষ করেছে কর্তৃপক্ষ।

পার্কের মূল ফটক ও কোর সাফারি ইজারা দিয়ে প্রতিবছর কয়েক কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের সুযোগ থাকলেও করোনার পর থেকে কাঙ্ক্ষিত ইজারাদার পাওয়া যাচ্ছে না বলে বন বিভাগ জানায়। ফলে পার্কের কিছু কার্যক্রম নিজেরাই পরিচালনা করছে কর্তৃপক্ষ।

পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তারেক রহমান বলেন, কম জনবল নিয়ে এত বড় পার্কের ব্যবস্থাপনা করা কঠিন। ইজারাদার পাওয়া গেলে ব্যবস্থাপনা আরও সহজ হবে।

বন বিভাগের বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এম কে এম ইকবাল হোছাইন চৌধুরী বলেন, কয়েকবার দরপত্র বিজ্ঞপ্তি দিয়েও কাঙ্ক্ষিত দর পাওয়া যায়নি। ৫ আগস্টের পর পার্কের বিভিন্ন ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে। এসব সমস্যা কাটিয়ে উঠতে বন বিভাগের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন 
 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ